অর্থনীতিতে নোবেল বিজয়ী প্রথম নারী কে ?

প্রশ্ন:  অর্থনীতিতে নোবেল বিজয়ী প্রথম নারী কে ? 


ক.  এলিজাবেথ ব্লাকবার্ণ

খ.  এলিনর ওস্ট্রম

গ.  অ্যাজ ইয়োনাথ

ঘ.  মাদাম কুরি 


উত্তর:  খ) এলিনর ওস্ট্রম  । 


ব্যাখ্যা:-


অর্থনীতিতে নোবেল বিজয়ী প্রথম নারী হচ্ছেন  " এলিনর ওস্ট্রম " । 


এলিনর অস্ট্রম (Elinor Ostrom) অর্থনীতির জগতে এক বিশিষ্ট নাম। তিনি ছিলেন প্রথম নারী যিনি অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। ২০০৯ সালে তার এই সাফল্য নারীদের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক স্থাপন করে। তার গবেষণা, যা সাধারণ সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং প্রতিষ্ঠানগত অর্থনীতির উপর কেন্দ্রীভূত, বিশ্বব্যাপী নীতি নির্ধারকদের এবং অর্থনীতিবিদদের মধ্যে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। এই প্রবন্ধে, এলিনর অস্ট্রমের জীবন, তার বৈজ্ঞানিক অবদান এবং নোবেল পুরস্কার পাওয়ার কারণ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।


 প্রাথমিক জীবন এবং শিক্ষা:


এলিনর অস্ট্রমের জন্ম ৭ আগস্ট, ১৯৩৩ সালে লস এঞ্জেলেস, ক্যালিফোর্নিয়ায়। তার বাবা জে. রায় অ্যাভারি এবং মা লিডিয়া মে অ্যাভারি ছিলেন একজন গৃহিণী। ছোটবেলা থেকেই এলিনর শিক্ষার প্রতি গভীর আগ্রহী ছিলেন এবং একাডেমিক বিষয়ে চমৎকার পারফরম্যান্স দেখিয়েছিলেন। 


তিনি ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, লস এঞ্জেলেস (UCLA) থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬৫ সালে তিনি UCLA থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। তার গবেষণার মূল বিষয় ছিল সামাজিক নীতি এবং প্রতিষ্ঠানগত অর্থনীতি।


 বৈজ্ঞানিক অবদান:


এলিনর অস্ট্রমের গবেষণা সাধারণ সম্পদ (common-pool resources) এবং প্রতিষ্ঠানগত অর্থনীতির উপর কেন্দ্রীভূত ছিল। তিনি দেখিয়েছেন যে স্থানীয় জনগোষ্ঠীগুলি কিভাবে নিজেদের সম্পদ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে পারে, যেখানে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ বা বেসরকারি মালিকানা নয়। তার কাজ প্রমাণ করে যে সামাজিক নীতি এবং স্থানীয় জ্ঞান ব্যবহারের মাধ্যমে সাধারণ সম্পদগুলিকে সুষ্ঠুভাবে ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব।


 সাধারণ সম্পদ ব্যবস্থাপনা:


এলিনর অস্ট্রমের সবচেয়ে বিখ্যাত তত্ত্ব হল সাধারণ সম্পদ ব্যবস্থাপনা। তিনি দেখিয়েছেন যে, সাধারণ সম্পদ ব্যবস্থাপনা কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ছাড়াও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মাধ্যমে সফলভাবে পরিচালিত হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, স্থানীয় জনগোষ্ঠী একটি সাধারণ বন বা জলাশয় সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে পারে, যদি তাদের নিজস্ব নিয়ম এবং সামাজিক মানদণ্ডগুলি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সম্মানিত হয়।


তার গবেষণা বলছে যে, সাধারণ সম্পদের ব্যবস্থাপনা একটি কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের প্রয়োজন নেই, বরং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জ্ঞান, অভিজ্ঞতা এবং সহযোগিতার উপর নির্ভর করতে পারে। এই তত্ত্ব প্রমাণ করে যে, স্থানীয় জনগোষ্ঠীগুলি কিভাবে নিজেদের সম্পদ সুষ্ঠুভাবে ব্যবস্থাপনা করতে সক্ষম, তা নিয়ে প্রচলিত ধারণাগুলিকে চ্যালেঞ্জ জানায়।

 

প্রতিষ্ঠানগত বৈচিত্র্য:


এলিনর অস্ট্রমের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব হল প্রতিষ্ঠানগত বৈচিত্র্য। তিনি দেখিয়েছেন যে, বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠান কার্যকর হতে পারে। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, একটি নির্দিষ্ট সমস্যার জন্য একটি নির্দিষ্ট সমাধান সবসময় কার্যকর নয়, বরং সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রেক্ষাপট এবং পরিস্থিতি বিবেচনা করা জরুরি।


নোবেল পুরস্কার:


২০০৯ সালে এলিনর অস্ট্রম অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। তিনি প্রথম নারী হিসেবে এই সম্মান অর্জন করেন। নোবেল কমিটি তার গবেষণা, যা প্রমাণ করে যে স্থানীয় জনগোষ্ঠীগুলি সাধারণ সম্পদগুলি সফলভাবে পরিচালনা করতে পারে, তার জন্য এই পুরস্কার প্রদান করে।


তার গবেষণার মাধ্যমে এলিনর অস্ট্রম দেখিয়েছেন যে স্থানীয় জনগোষ্ঠীগুলি কিভাবে নিজেদের সম্পদ সুষ্ঠুভাবে ব্যবস্থাপনা করতে পারে এবং কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ বা বেসরকারি মালিকানা ছাড়াও সাফল্য অর্জন করতে পারে। তার কাজ প্রমাণ করে যে, সাধারণ সম্পদের ব্যবস্থাপনা স্থানীয় জ্ঞান, সহযোগিতা এবং সামাজিক নীতির উপর নির্ভর করতে পারে।


প্রভাব এবং উত্তরাধিকার:


এলিনর অস্ট্রমের গবেষণা এবং তত্ত্ব বিশ্বব্যাপী নীতি নির্ধারকদের এবং অর্থনীতিবিদদের মধ্যে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। তার কাজ স্থানীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে একটি নতুন ধারণা নিয়ে এসেছে, যা পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান।


 পরিবেশ সংরক্ষণ:


এলিনর অস্ট্রমের তত্ত্ব পরিবেশ সংরক্ষণে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তার কাজ প্রমাণ করে যে স্থানীয় জনগোষ্ঠীগুলি কিভাবে নিজেদের বন, জলাশয় এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ সুষ্ঠুভাবে ব্যবস্থাপনা করতে পারে। তার গবেষণার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সহযোগিতা এবং অংশগ্রহণের মাধ্যমে প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ করা সম্ভব।


 স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়ন:


এলিনর অস্ট্রমের তত্ত্ব স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তার কাজ প্রমাণ করে যে, স্থানীয় জনগোষ্ঠীগুলি কিভাবে নিজেদের সম্পদ সুষ্ঠুভাবে ব্যবস্থাপনা করতে পারে এবং তাদের ক্ষমতায়ন করতে পারে। তার গবেষণার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে, স্থানীয় জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতা ব্যবহারের মাধ্যমে সাধারণ সম্পদের ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব।


 উপসংহার:


এলিনর অস্ট্রম ছিলেন এক অনন্য প্রতিভা, যার গবেষণা এবং বৈজ্ঞানিক অবদান মানব ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। অর্থনীতিতে নোবেল বিজয়ী প্রথম নারী হিসেবে তিনি একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি এবং তত্ত্ব নিয়ে এসেছেন, যা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়ন এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।


তার কাজ এবং আদর্শ আমাদের সবার জন্য অনুপ্রেরণা এবং অর্থনীতির ক্ষেত্রে নতুন চিন্তাভাবনার পথপ্রদর্শক। এলিনর অস্ট্রমের জীবন এবং কাজ প্রমাণ করে যে নিষ্ঠা, কঠোর পরিশ্রম, এবং সৃজনশীল চিন্তাভাবনার মাধ্যমে অর্থনীতির জটিল সমস্যাগুলি সমাধান করা সম্ভব। তার তত্ত্ব এবং গবেষণা স্থানীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এসেছে, যা পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান।





Next Post Previous Post